Wednesday, August 15, 2012

বৃষ্টি, অতীত আর অভিমানের গল্প...

বৃষ্টি, অতীত আর অভিমানের গল্প...

by Asif Bayezid on Saturday, 17 March 2012 at 23:19 ·

পুরান ঢাকা’র ওয়ারী’র এক কাবাব এর দোকান। দোকানের নাম কোয়ালিটি কাবাব। ভেতরটাতে দোকানের মালিক বেশ একটু বনেদী ভাব আনার চেষ্টা করেছে, ফল হয়েছে উলটো- সাদা টাইলস লাগান দেওয়ালের কারনে খানিকটা বাথরুম বাথরুম ভাব এশে যায়। চারটা টেবিল, আটখানা বেঞ্চের প্রতিটাতে ২ জন করে বসতে পারে। বন্ধুপ্রবর ইমরান একটা টেবিলে জায়গা করে নিতে নিতে “এই টেবিলে ক্যাঠা...??” বলে হাঁক পেড়ে উঠলো! আমোদ পেলাম। আর দুইজন স্থানীয় লোক এর সাথে টেবিল ভাগাভাগি করে বসতে হলো। পাড়া’র উঠতি ছেলে-ছোকরাদের একটা দল এসে ঢুকেছে আমাদের সাথেই, দলনেতা’র উচ্চস্বর কানে আসছে, “তগো সবডির বিল আমি দিমু, আমার বিল তরা সবডি মিল্লা দিবি...” বোঝা গেল বান্দা কঠিন খাওয়াদাওয়া করার নিয়ত করে এসেছে!

সন্ধ্যা থেকেই বাতাস আর্দ্র। বছরের প্রথম বৃষ্টি’র আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। হঠাত দমকা বাতাস দিল, আসে-পাশের সব কয়টা দোকানের কর্মচারীরা হই হই করে দোকানের শাটার ফেলতে লাগলো বিকট শব্দ করে। শীতল বাতাসের সাথে পানি’র ছাঁট এসে গায়ে-মুখে লাগলো, সে এক অনুভূতি! সব মিলিয়ে অসাধারণ একটা পরিবেশ, এমন সময় দুম করে পাশের ট্রান্সফরমার বার্স্ট করলো! বাতি গেল নিভে, গরম কাবাব মুখে পুরে অসাবধানে জিব পুড়িয়ে ফেললাম। মিনিট এক-দুই পর বেয়ারা এসে সব টেবিলে মোমবাতি জ্বালিয়ে দিয়ে গেলো। মোম এর আলোয় স্বপ্নময়তা’র ষোলোকলা পূর্ণ হলো। কাবাবের দোকানে বৃষ্টি’র সন্ধ্যায় আটকে পড়েছে, মোম এর আলোতে প্রত্যেকের মুখ রহস্যময় হয়ে উঠেছে, অনিয়মিত বাতাসের সাথে বাতি’র শিখাও অস্থির ভাবে কাঁপছে, সবকয়টা মানুষের চেহারা’র আলোকিত অংশও সেকেন্ডেই পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে! যাদের উঠবার তাড়া ছিলো, তারাও কেমন গা এলিয়ে আড্ডায় বসে গেছে। খুব কাছের একটা টেবিল থেকে চায়ের কাপে আরামদায়ক চুমুক এর শব্দ এলো।

খুব সাধারণ স্বাভাবিক একটা সন্ধ্যা। ঠিক এমনটাই হওয়ার কথা, এমনটাই হয়। কিন্তু দোকানে আটকে পড়া এই অল্প কিছু সময় কেমন ঘোর লাগা মনে হয়। মোমবাতি’র অস্থির কাঁপতে থাকা শিখাগুলো এত প্রাচীন কেন যে লাগতে থাকে বুঝি না, খেতে আসা মানুষগুলোকে মনে হয় কতশত বছর আগে প্রাচীন শহরে বাস করা চরিত্র। নিজেও ওয়ারী’র গলি’র কোনে অখ্যাত এক কোয়ালিটি কাবাব এর দোকানে বসে এমন অতীতে চলে গেছি ভাবতেও যেন কেমন কাঁটা দিয়ে উঠে! কিন্তু এত ভাবার সময় কই? ভাবনায় খ্যান্ত না দিলে দূর্যোগ এর রাতে লোকাল বাস ধরতে পারবো না, পৌঁছুতে পারবো না বাসায় ঠিক সময়ে, করা হবে না লেসন প্ল্যান, নিউ পল্টন লাইন হাই স্কুল এর তৃতীয় শ্রেণী’র ক শাখা’র মেয়েগুলো’র শেষ করা হবে না ইংরেজী লেখায় বড় হাতের অক্ষর কখন হয় তা শেখা...!! প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চীম ওয়াইজম্যান নাকি চেইম ওয়েইজম্যান ইসরায়েল এর প্রেসিডেন্ট হলেন আর শালার ইহুদি জাতি’র জায়োনিসম পৃথিবীকে শেষ করে দিচ্ছে সেই বিতর্কও কেমন ঝাপসা হয়ে আসে, বৃষ্টি’র ছাঁট উপেক্ষা করেই রাস্তায় নেমে পড়ি... “অয়ে মতিঝিল ফারামগেট মিরপুর এক নম্বর...” বলে চিল্লাতে থাকা হেল্পারটার পাশ গলে বাসে উঠে পড়তে হয় সময় নষ্ট না করে, নয়তো তৃতীয় শ্রেনী’র কোনো একটা ছোট্ট মেয়ে স্যার এর মুখে নতুন গল্প না শুনতে পেয়ে চোখ ছল ছল করে বসে থাকবে, প্রবল অভিমানে...সে অভিমান সামলানো যে কোনো দূর্বল মানুষের কর্ম নয়...

No comments:

Post a Comment