Wednesday, May 8, 2013

যন্ত্রনগরে খানিকটা আকাশ



নগর জীবনে এতো ব্যস্ততার চাপে পরিচিত আপনজনদের মুখের দিকে তাকিয়ে একটু স্বস্তির হাসি মেলাই আজকাল ভার হয় পড়েছে। মুক্ত খোলা হাওয়ায়, গেলো গ্রীষ্মের অসহ্য দাবদাহে প্রাণ যায় যায় দশা। বাসে ঝুলে, ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে হেঁটে, দিনভর দুশ্চিন্তা আর পরিশ্রমে জর্জরিত অন্যান্য ঢাকাবাসী’র মতো আমারও ইচ্ছে করে নির্মল কিছু সময় কাটাতে। সেই সময়টুকুর খোঁজেই ছবি তোলার শখ। বহু আকাঙ্খিত সেই মুক্তির সন্ধানে, অবাক করা হলেও, খুঁজে পেলাম আকাশের কিছু ছবি। আমাদের আকাশ কিন্তু খুব অসুন্দর না, এক চিলতে পরিমান খুঁজে পাওয়াই ভার কেবল।

পাঠকের বিচার এবং মন্তব্যের অপেক্ষা করে রইলাম। বলাই বাহুল্য ছবিগুলি মুঠোফোনে ধারণ করা, মডেল নোকিয়া কোম্পানির এন-৯৭।



                                      নিউমার্কেটের সাম্নে’র রাস্তাটা থেকে...






                                   ঢাবির ভিসি চত্ত্বর থেকে তোলা অদ্ভূত মেঘ...







                 পূবপানে মেঘলা ভোর, বারান্দা থেকে, ফোকাস হয়েছে বারান্দার বেরসিক গ্রিল...



 





                                                           পলাশী মোড়ে...



 




                                          রোদচশমা’র ভিতর দিয়ে তোলা।

 






                                                   ঢাবি মল চত্তর থেকে।


 




                                                  “এই মেঘ রৌদ্র ছায়া”


 






                                                                 মেঘ-পাখি



 










                                                                                 অলস দুপুরে








                                                      লালবাগ কেল্লায়

নিজের ভেতর



খুব ভিঁড়ের মধ্যেও একা হয়ে যাওয়ার ব্যপারটা কেমন জাদুকরী। বাসে গাদাগাদি মানুষ। পেছনের দিকের দরজটার রডে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার সময় আমার পায়ের উপর কাদাঅলা জুতা দিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করছে ভিতরে উঠে যাওয়ার। আরে ভাই, ভিতরে যাবিটা কোথায় তা তো একটু বুঝার চেষ্টা কর। হাতে ব্রাউন পেপারের খাম, সিথি সরে গিয়ে টাক বের হয়ে পড়েছে, একটা হাত বাসের বাইরে, ছাতাটা সেই হাতে, চোখ কেমন উদভ্রান্ত! কেন? একটু সেন্স থাকলে কী সমস্যা? এই অবস্থায়ও নিজের মধ্যে ঢুকে একা হয়ে যাওয়া যায়। বিছিন্ন হয়ে যাওয়া যায় ঠাসাঠাসি, ঘাম, কাদা থেকে। দৃশ্যপটের কিছু আর ঠিক প্রভাব ফেলে না। যেখানে রেগে যাওয়ার কথা, সেখানেও নিজের ভেতর থেকে যেন বের হয়ে না আসা লাগে, সে জন্য সব ছাড় দিয়ে ফেলতে হয়।
 
আরেকবারের কথা মনে পড়ে। ফরয কয়েকটা এসএমএসের রিপ্লাই লিখে মোবাইলটা পকেটে রাখলাম। গ্রীষ্মের মধ্যাহ্ন। তার পরও বাসে ভিড়। কীভাবে যেন আমি বসার সুযোগ পেয়েছি। বেশ একটু তন্দ্রাভাবও যে আসছে না, তা নয়। দুই সিট সামনে দুই ভদ্রলোক কথা বলছেন। দু’জনই চরম উতসাহে কথা বলে যাচ্ছেন। বোঝা গেলো বাসেই পরিচয়। গার্মেন্টস ব্যবসায় “কত সুতায় কত লাভ” টাইপের আলোচনা। দুজনই দু’জনকে সমানে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন। পারলে দুজনই দাঁড়িয়ে পড়েন এমন অবস্থা! এই আলোচনার যে কোন ভবিষ্যৎ নাই, তা-ও দুজনেই জানেন, দু’জনের একজনও ব্যবসায়ী নন! আমার পাশে দুই বন্ধু বসেছে। কে কার ঘাড়ে হাত রাখবে সেই নিয়ে হাতাহাতি! একা হয়ে যাওয়ার ব্যপারটা কী অদ্ভুত, এই কান্ডগুলা যে আমি দেখছি, আমার মগজে গেঁথে যাচ্ছে, এটা কেউ জানে না, কারো মাথাব্যথাও নাই! আমিত্ব কী ভয়ানক!

ক্লাসের এক্কেবারে সামনের সারিতে বসা। লেকচারও হয়তো লিখছি। কেউ কেউ নিজেরা কথা বলছে। কেউ আবার অধ্যাপকের সাথে বাকবিতন্ডায় জড়িয়ে পড়ছে। কেউ একটু সুযোগ পেয়ে বিসিএস বইটা খাতার তল থেকে বের করছে। পাশের জনকেই দেখা যাচ্ছে খাতার কোনায় কী এক নকশায় ব্যস্ত। এই জিনিসগুলা যে ঠিক পরিষ্কার ভাবে দেখা, তা কিন্তু নয়। দৃষ্টি না দিয়েও বুঝে ফেলার মত। আসলে দেখছি কাচের জানালার বাইরে এক চড়ুই ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করছে, কাচের বিষয়টা তাঁর কাছে পরিষ্কার না। কোন চিন্তাটা এ্যাক্টিভ আর কোনটা যে প্যাসিভ নিজের কাছেই গুলিয়ে যায়। কিন্তু তা পুরোপুরি একা, নিজের ভিতরে।

বৃষ্টির রাতে মানিকগঞ্জগামী কোন বাসে উঠে পড়লে সবচেয়ে মজাটা হয়। সামনের দিকে কয়েকটা সিট জুড়ে থাকে খুচরা বণিকশ্রেণীর পণ্যের বোচকা। তাই বসতে হয় মাঝামাঝি দিকে। বাস চলতে শুরু করলে জানালাটা খুলে দিয়ে পানির ঝাপটা আসতে থাকে। চশমার কাচে অনেক ছোট ছোট বিন্দু জমে থাকার কারণে অন্ধকার রাস্তায় যেকোন আলোর উৎসটুকু অদ্ভুত লাগতে থাকে। বাসের ভিতরে মানুষজন মৃদুমন্দ কথা বনলতে থাকে। কোন ছোট বিপনীর কর্মচারী ছেলেটা হয়তো তার নতুন কেনা চাইনিজ সেটে “চুরা লিয়া হ্যায়” গান বাজিয়ে ফেলে। আর এতগুলো মানুষ নিজেদের অজান্তেই আমাকে আমার ভিতর শতাধিক বার হারিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়।

রাস্তায় একা হাটার সময় হঠাট চোখে পড়ে যায় চেক শার্ট পরা প্রেমিকটির দিকে কী গভীর দৃষ্টি ফেলে তাকিয়ে আছে তরুণীটি। অন্য আর কিছু কি আলোড়িত করছে তাদের? আবার চোখে পড়ে দামী পোষাকের দোকানের সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়া কোন এক নারীকে। হাতে মা’র কথা মনে করে কেনা এক জোড়া আনারস, দোকানের দিয়ে তাকিয়েও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে দ্রুত এগিয়ে যান বাসার দিকে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সিড়িতে দেখা যায় জমজমাট আড্ডার মধ্যেও এক পাশে বসে থাকা উশকো-খুশকো চুলের তরুণকে। কী ভাবছে সে, বড় জানতে ইচ্ছে করে।
 
জীবন বিষয়টা কী রহস্যময় তাই না? বেঁচে আছি। নিজের ভেতর আছি। নিজের বাইরেও আছি। শ্বাস নিচ্ছি। চোখের পলক ফেলছি। খাবার চাইছি। কথা বলছি। এখন কী বোর্ডে টাইপ করছি। কত চিন্তা একই সাথে মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, আসছে, আবার চলেও যাচ্ছে, কোনটা যে চলে গেলো মনেও থাকছে না। লিখছি বলে যে লেখাটুকুর সাথেই কেবল আছি তা-ও নয়। স্বার্থপরের মত বার বারই নিজের ভেতর ঢুকে পড়ছি। বেঁচে থাকছি।